চিলেকোঠার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলেই বাতাসটা বদলে যায়। উত্তর কলকাতার সেই পুরোনো বাড়ির ছাদে ওঠার মুখে একটা মেহগনি কাঠের টেবিল পড়ে আছে বহু বছর ধরে। কোনো এক যুগে সেটি ছিল সুলেখার পড়াশোনার টেবিল। এখন তার ওপর জং ধরেছে, ধুলোর এক পুরু আস্তরণ জমেছে, আর কোনো এক বর্ষার রাত্রে গড়িয়ে পড়া জলের দাগ হয়ে আছে এক অদ্ভুত মানচিত্রের মতো।
টেবিলের ওপর রাখা একটা তামার কালির দোয়াত। কালি শুকিয়ে গেছে কতকাল আগে, তবু যদি তার মুখে নাক ঠেকানো যায়, যেন মনে হয় মেঠো গন্ধ আর পুরানো দিনের কাগজ ভিজলে যে গন্ধ বের হয়, তার এক মায়াবী মিশ্রণ ভেসে আসছে।
সুলেখা আজ বিশ বছর পর এই ঘরে পা রেখেছে।
দরজার কাঠের কপাট খুলতেই একটা চেনা ঘড়ঘড় শব্দ হলো। যেন সময় পিছিয়ে গেল বিশ বছর।
"তুমি এসেছ?" — মনে হলো কেউ যেন বলল। অথবা ওটা কি শুধু বাতাসের শিস?
পকেটের ভেতর থেকে হাত বের করে সুলেখা টেবিলের ড্রয়ারটা টানল। কাঠের ওপর কাঠ ঘষার আর্তনাদ উঠল। ড্রয়ারের এক কোণে পড়ে আছে নীল রঙের বাঁধাই করা একটা খাতা। পাতাগুলো হলুদ হয়ে এসেছে, মড়মড় করে উঠল উল্টাতেই।
খাতার প্রথম পাতায় লেখা:
*“যেটুকু আলো আমি পাই, তা দিয়ে সবটা দেখা যায় না। কিন্তু যতটুকু দেখা যায়, তাতেই জীবনের অর্থ লুকিয়ে থাকে।”*
সুলেখা খাতাটি বন্ধ করে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। বাইরে তখন অঝোরে নামছে শ্রাবণের শেষ বৃষ্টি। ছাদের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল ফোঁটায় ফোঁটায় আছড়ে পড়ছে মেহগনির গায়ে।
